শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন
মুজিব বর্ষ
শিরোনাম :
গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা আদালতের সামনে মামলার বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি! জিনিয়া আক্তার সুইটি দিনাজপুর পৌরসভার ১ ঘন্টার প্রতিকী মেয়রের দায়িত্ব পালন করলেন বাগেরহাটে তরুনী ধর্ষন মামলাঃ ইউপি সদস্যসহ ৫ জনের দুই দিনের রিমান্ড জবিতে ‘বাংলাদেশের উপন্যাসে দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ শিরোনামে পিএইচ.ডি সেমিনার অনুষ্ঠিত ত্রিশালে মায়ের হাতে শিশু খুন ফ্রান্সে মহানবীর ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে ঝালকাঠিতে ইসলামী আন্দোলনের বিক্ষোভ নীলফামারী সদর ৫ নং টুপামারীর ইউনিয়ন পরিষদে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ। তারাগঞ্জে গরুবাহী নসিমনের নিচে চাপা পড়ে নিহত একজন আউচপাড়া ইউনিয়নের হাড়িপাড়া বিল,ব্যক্তি মালিকানা জমি লিজের মাধ্যমে এলাকাবাসীর মাছ চাষ জবির পরিবহন পুলে নতুন দুইটি এসি মাইক্রোবাস

নয়ন বন্ড যেভাবে তৈরি… ‘জেমস বন্ড থেকে যেভাবে নয়ন বন্ড’

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৯
  • ১১৬ Time View

জেলা প্রতিনিধি, বরগুনা।।

বরগুনা শহরে প্রকাশ্য রাস্তায় শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তদন্তের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে বন্ড ০০৭ নামে একটি গ্রুপের কিছু কথোপকথন। বলা হচ্ছে, ওই ফেইসবুক গ্রুপেই রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা সাজানো হয়। এই গ্রুপের নামকরণ হয়েছে জেমস বন্ডের কোড নম্বর ‘জিরো জিরো সেভেন’ এর সঙ্গে মিল রেখে। আর এই গ্রুপের নেতা হলেন রিফাত হত্যার হোতা নয়ন বন্ড, যাকে পুলিশ গত তিন দিনেও গ্রেফতার করতে পারেনি।

প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিংয়ের উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র জেমস বন্ড। তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও কমিকস। বাংলাদেশে জেমস বন্ড না থাকলেও একজন নয়ন বন্ড আছেন। তিনি নিজেই এই উপাধি নিয়েছেন। তাঁর শক্তির উৎস মাদক ও ক্ষমতার রাজনীতি।

পরিবারের দেওয়া নাম সাব্বির আহম্মেদ, ডাক নাম নয়ন। নিজেকে জেমস বন্ড ভাবতে ভালোবাসেন বলে ২৫ বছর বয়সী ওই যুবক নিজের নাম নিয়েছেন নয়ন বন্ড। ওই নামেই তিনি বরগুনা শহরে পরিচিত। তার মোটর সাইকেলে, বাড়ির দেয়ালে- নানা জায়গায় লেখা রয়েছে বন্ডের সেই ০০৭ কোড নামটি।

বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন জানান, পৌর শহরের বিকেবি রোডের ধানসিঁড়ি এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকীর ছেলে নয়নের বিরুদ্ধে মাদক কেনাবেচা, চুরি, ছিনতাই, হামলা, সন্ত্রাস সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগে অন্ততঃ আটটি মামলা রয়েছে।

নয়নের গড়ে তোলা গ্যাং ০০৭ শহরের কলেজ রোড, ডিকেপি, দীঘির পাড়, কেজিস্কুল ও ধানসিঁড়ি এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ চালিয়ে আসছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

তারা বলছেন, ওই গ্রুপে নয়নের প্রধান সহযোগী হলেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে রিফাত ফরাজী।

নয়ন বন্ড যেভাবে তৈরি

প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিংয়ের উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র জেমস বন্ড। তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও কমিকস। বাংলাদেশে জেমস বন্ড না থাকলেও একজন নয়ন বন্ড আছেন। তিনি নিজেই এই উপাধি নিয়েছেন। তাঁর শক্তির উৎস মাদক ও ক্ষমতার রাজনীতি।

গত বৃহস্পতিবার যখন প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে হত্যা করা হয় , তার পর থেকেই সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ডের পরিচয় প্রকাশ পেতে শুরু করে। তিনি এলাকায় মাস্তান হিসেবে পরিচিত ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নিজেও মাদক সেবন করেন। বরগুনার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবং পুরোনো পত্রিকা ঘেঁটে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়টি বের হয়ে আসে। নয়ন বন্ড কোনো পদে না থাকলেও আত্মীয়তা ও ‘বড় ভাই’ সূত্রে ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১১ সালে এসএসসি পাস করে নয়ন আর পড়াশোনা করেননি। তাঁর বন্ধু রিফাত ফরাজী ও তাঁর ছোট ভাই রিশান ফরাজী সাবেক সাংসদ ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে।

বরগুনার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সাংসদ ও সাবেক উপমন্ত্রী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন। গত সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের এই দুই নেতা একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখলবাজি, মাস্তানি, মাদক ব্যবসা, বিএনপি-জামায়াত তোষণের অভিযোগ আনেন। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ী নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলেননি। বরং উভয় পক্ষ তাঁদের হাতে রাখার চেষ্টা করেছেন। এটি তাঁদের ও সহযোগীদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে স্পষ্ট।

নয়ন বন্ডের প্রশ্রয়দাতা আলোচনায়

দিবালোকে শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার মূল আসামিরা জেলা আওয়ামী লীগের চিরচেনা দুই প্রতিপক্ষের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর পক্ষের লোকজনের অভিযোগ, রিফাতের হত্যাকারী রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। দেলোয়ার হোসেনের প্রশ্রয়েই এ দুই ভাই রিফাত হত্যার মতো অপরাধে দুঃসাহসী হয়ে উঠে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে দেলোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে ও জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. সুনাম দেবনাথের ছত্রছায়ায় রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডসহ অন্যরা বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছে বলে তিনি শুনেছেন।

রিফাত হত্যার পর গত ২৭ জুন হত্যাকারীদের ফাঁসি চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন সুনাম দেবনাথ। এতে তিনি রিফাত হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামী রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীকে বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে উল্লেখ করে এ দুই ভাইয়ের বিভিন্ন সময়ে ঘটানো কিছু অপকর্মের চিত্র তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে দেলোয়ার হোসেনের কাছে গেলে তিনি অভিযোগকারীদের নানাভাবে অপদস্ত করতেন। আর তার এমন প্রশ্রয়ে ওই দুই ভাই এতো বেপরোয়া হয়ে উঠে। তবে সুনাম দেবনাথের এ ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে কথা উঠলে তিনি স্ট্যাটাসটি ‘হাইড’ করে ফেলেন।

সুনাম দেবনাথের ফেসবুক স্ট্যাটাস নজর এড়ায়নি দেলোয়ার হোসেনের। এ নিয়ে শুক্রবার (২৮ জুন) রাতে বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এসময় তিনি হত্যাকারীদের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই দাবি করেন এবং হত্যাকারীদের ফাঁসি চান।

২৭ জুন হ্যাশট্যাগ দিয়ে ফেসবুকে সুনাম দেবনাথ লিখেন, ‘আমার ভাইয়ের জীবন গেলো রক্ত – স্রোত-বন্যায়/ক্ষমতাধরের ভায়রার ছেলে, মুখ খোলা তাই অন্যায়!’ এরপর তিনি লিখেন, ‘প্রথমেই আমরা স্পষ্ট হবো নাম নিয়ে। কারণ যে মারা গেছে আর যারা মেরেছে তাদের নাম এক হওয়াতে আমরা গুলিয়ে ফেলছি। কাকতালীয়ভাবে দুই জনের বাবার নামও এক। যে ছেলেটিকে হত্যা করা হলো তার নাম রিফাত শরীফ, পিতার নাম দুলাল শরীফ, সাং: ৬ নং ইউনিয়ন। আর হত্যাকারীদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে নয়ন এবং তার সহযোগী হচ্ছে রিফাত ফরাজী, পিতা দুলাল ফরাজী, সাং বরগুনা ধানসিঁড়ি রোড এবং আরেক সহযোগী হচ্ছে রিফাতের ছোট ভাই রিশান ফরাজী, পিতা ও সাং: ওই। এই রিফাত ও রিশানের অন্য এক পরিচয় রয়েছে, তারা দু’জনই সাবেক সাংসদ ও বর্তমান জেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। যারা আদর করে তাকে (দেলোয়ার হোসেন) বাবা বলেই সম্মোধন করে।’

সুনাম দেবনাথের স্ট্যাটাসে উল্লেখ, ‘রিফাত ও নয়নদের আরও একটি পরিচয় আছে। তারা অত্র এলাকায় এমন কোনও ছাত্রাবাস নাই; যেখান থেকে ছাত্রদের ল্যাপটপ, মোবাইল, টাকা ইত্যাদি চুরি বা ছিনতাই করে নিয়ে আসে নাই। এ নিয়ে বহুবার মামলা হয়েছে, বহুবার তারা জেল খেটেছে, কিছুদিন পর আবার ছাড়াও পেয়েছে। তাদের নামে কতগুলো মামলা রয়েছে তা থানা কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে।’

এই স্ট্যাটাসে বলা হয়েছে, ‘নয়ন (নয়ন বন্ড) সব থেকে বেশি নজরে এসেছে তখন, যখন সে একটি বড় ধরনের মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছিল। প্রায় ১২ লাখ টাকার মাদক নয়নের কাছ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। রিফাত ফরাজীর বিভিন্ন অপকর্মের নালিশ থানায় দেওয়ার পাশাপাশি তার খালু জেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের কাছেও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বারবার নালিশকারীদের সেখান থেকে অপমান, অপদস্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।’

স্ট্যাটাসে প্রকাশ, ‘ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজনের নাম তরিকুল ইসলাম। ২০১৭ সালে একবার এই রিফাত আর রিশান ফরাজী সামান্য কথাকাটিতে তাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছিল। এ নিয়ে তরিকুলের বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলাও করেছিলেন। বিচার নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের খালু দেলোয়ার হোসেনের কাছে। কিন্তু অপমানিত হয়ে ফিরতে হয় তাদের। এরপর ভয়ে তিনি তার ছেলে তরিকুলকে বরিশালে পড়ালেখা করতে পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে তরিকুল বরিশালে পড়ালেখা করছে। আরও একজন ভুক্তভোগী হচ্ছেন বরগুনা পৌরসভার একজন কাউন্সিলর, নান্না কমিশনার। তার বাসায় কিছু ছাত্র ভাড়া থাকে। সেখান থেকে এই রিফাত ফরাজী ৫টা মোবাইল ছিনতাই করে এবং এর প্রতিবাদ করায় এই রিফাত ফরাজী তার (নান্না কমিশনার) সামনে রামদা নিয়ে আসে। নান্না কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের একজন প্রধান কর্মী হওয়াতে তার কাছে নালিশ দিলে তাকেও সেখান থেকে অপমানিত হয়ে আসতে হয়। এরকম ঘটনা রিফাত করতেই পারে না বলে তাকে (নান্না কমিশনার) সেখান থেকে অপমান করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ডিকেপি রোডের ডা. আলাউদ্দিনের বাসায় কিছু ছাত্র ভাড়া থাকতো; সেখান থেকে এই রিফাত প্রায় ২০টি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ছিনতাই করে নিয়ে আসে। পরে তখনকার ওসি রিয়াজের হস্তক্ষেপে রিফাত ফরাজীর বাবাকে থানায় এনে সেই সব মোবাইল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া, বিভিন্ন সময় তারা অন্য ছাত্রাবাস থেকে মোবাইল, ল্যাপটপ ছিনতাই করে নিয়ে আসতো। এরকম আরও অনেক ঘটনা আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।’

স্ট্যাটাসটিতে সুনাম দেবনাথ উল্লেখ করেন, “যে ছেলেটির (তারিকুলের) ঘটনা প্রথমেই বলেছি, সে বর্তমান ঘটনার (রিফাত হত্যা) প্রেক্ষিতে ফেসবুকে লিখেছে, ‘২০১৭-তে আমার ঘটনার বিচার হলে আজ রিফাতের প্রাণ হারাতে হতো না”। লেখাটি কতটা গুরুত্ববহ, এখন আমরা বুঝতে পারছি।’

সুনাম দেবনাথের দাবি, ‘রিফাত শরিফ আমাদের খুব কাছের ছোট ভাই ও কর্মী ছিল। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের সঙ্গে থেকেই নির্বাচনি প্রচারণা করেছে। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছে, রিফাতের মৃত্যু সংবাদে। তবে এ খুনের পেছনে আরও অনেক রহস্য আছে। বিভিন্ন মিডিয়াতে যাকে এখন হিরো বানানো হচ্ছে; মূল ভিলেন সে নিজেও হতে পারে। রিফাত শরিফের বন্ধুদের থেকে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে এটাই বোঝা যায়, আর একটু সময় পার হলে হয়তো আরও ক্লিয়ার হওয়া যাবে।’

এ স্ট্যাটাসের ব্যাপারে সুনাম দেবনাথ বলেন, ‘আমি স্ট্যাটাসে যা লিখেছিলাম, সেটা দিনের আলোর মতো সত্য। আমি বলেছিলাম, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। আমি কোথাও বলিনি, তিনি খুনি বা তার নির্দেশে এই খুন হয়েছে।’

সুনাম দেবনাথের দাবি, ‘আমাদের কাছে নয়ন, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আসতো, তখন তার (দেলোয়ার হোসেন) কাছে পাঠালে তিনি বিচার না করে বরং উল্টো আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলতেন। কিন্তু সেই সময় যদি উনি তার ভায়রার ছেলেদের সঠিক বিচার করতেন, তাহলে আজকে তারা আর এত বড় অপরাধ করার সাহস পেতো না।’

আপনার ফেসবুক স্ট্যাটাস কেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, জানতে চাইলে সুনাম বলেন,  ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার বিষয়টি জেলা আওয়ামীলীগের নজরে এসেছে। তাই আমি স্ট্যাটাসটি হাইড করে রেখেছি।’

আপনার ছত্রছায়ায় নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী বিভিন্ন অপকর্ম করতো, বিভিন্ন সময় আপনি তাদের শেল্টার দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে, একথার জবাবে সুনাম দেবনাথ বলেন, দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক বিরোধিতা দীর্ঘদিনের, সেটা বরগুনাবাসী জানে। এই ক্ষেত্রে তার লোকজনকে প্রশ্রয় দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। বরং বিভিন্ন সময় আমি তাদের আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবার বের হয়ে যেতো।’

এদিকে, সুনাম দেবনাথের স্ট্যাটাসের জের ধরে শুক্রবার রাতে বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন দেলোয়ার হোসেন। এসময় তিনি দাবি করেন, ‘রিফাত হত্যার ঘটনায় জড়িতদের আমি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। এই খুনের মূলহোতা নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী। ফেসবুকে দেখি, আমাকে নিয়ে একটা নোংরা খেলা শুরু হয়েছে। কারণ রিফাত ফরাজী আমার আত্মীয়। ওদের সঙ্গে আমার কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই। ওরা আমার ছেলেও না, ভাইও না, ভাইয়ের ছেলেও না, বোনের ছেলেও না, কিচ্ছু না। বিয়ের সূত্রে রিফাত আমার আত্মীয়। এমন অনেক আত্মীয় থাকে সবারই। তারা কেউ ভালো হয়, কেউ খারাপ হয়, কেউ চোর হয়, কেউ সন্ত্রাসী হয়, ডাকাত হয়। সুতরাং এখানে আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার কারণটা কী, আমি ঠিক বুঝতে পারি না। আমি এদের কোনোদিন প্রশ্রয় দিইনি।’

সুনাম দেবনাথের ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওদের (রিফাত ফরাজী ও রোশান ফরাজী) সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই গত ৪-৫ বছর ধরে; কোনও সম্পর্কই নেই।’

বিভিন্ন সময় আপনার কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে আপনি নাকি অভিযোগকারীদের অপমান-অপদস্ত করতেন, এ প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট কথা।’এসময় তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমি নয়ন বন্ডকে চিনি না। কিন্তু শুনেছি, এই নয়ন নাকি সুনামের শিষ্য। সুনামের নেতৃত্বেই নয়নরা বিভিন্ন অপকর্ম করতো।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু সূত্র জানায়, বিভিন্ন মামলায় নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী কারাগারে গেলে মোতালেব মিয়া ও হুমায়ন কবির পল্টু নামের দুই আইনজীবীর মাধ্যমে তারা শিগগিরই মুক্ত হয়ে যেতো। এই দুই আইনজীবী দেলোয়ার হোসেনের খুব কাছের লোক।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘রিফাত ও রিশান যখন মাদকে জড়ায়, তারপর থেকে আমি ওদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করি। আমার স্ত্রীকেও তাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলি।’

বরগুনা সরকারি কলেজেরআতঙ্কনয়ন:

রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার পর একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। এ কান্ডে মূল অভিযুক্ত নয়ন বন্ড এখনও পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় বাসিন্দা ও শির্ক্ষাথীরা বলছেন, এই নয়নই ছিল বরগুনা সরকারি কলেজের এক আতঙ্কের নাম। গতকাল শনিবার স্থানীয় গনমাধ্যমের কর্মীরা সরেজমিনে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে ঘটনাস্থলের আশেপাশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পায়।

শিক্ষার্থীরা বলছে, বরগুনার কলেজ রোড, ডিকেপি, দীঘিরপাড়, কেজিস্কুল ও ধানসিঁড়ি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় দাপিয়ে বেড়াত নয়ন ও তার সহযোগীরা।

বরগুনা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা ও তার সহপাঠীরা বলেন, নয়নকে তারা চিনেন। নয়ন ও তার সহযোগীরা কলেজের সামনে আড্ডা দিত। সেখান দিয়ে যাতায়াত করলে বিভিন্ন ধরনের কথা বলত। কেউ কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি।

আরেক শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম বলেন, কলেজের অলিখিত ভিপি ছিলেন নয়ন। আমরা তাকে নয়ন বন্ড হিসেবে চিনি। যখন তখন সে কলেজে ঢুকে চিল্লাফাল্লা করত। আমাদের ডেকে যোগ দিত।

কলেজের সামনে দোকানদাররা জানান, কলেজের সামনে এই রোডটাতে প্রতিনিয়তই নয়ন ও তার গ্রুপের সদস্যরা মারামারি করত। তারপর থেকে তাদের মারামারি নজরদারিতে আনতে এই রোড জুড়ে একাধিক সিসি ক্যামেরা বসানো হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাদক কারবারি থেকে শুরু করে, মারামরি, ছিনতাইসহ নানা অভিযোগ নয়নের বিরুদ্ধে। আর সবগুলো কাজ এই কলেজ রোড এলাকায় করতেন নয়ন।

মূল নাম সাব্বির আহমেদ নয়ন হলেও কর্মকান্ডের জন্য রহস্য উপন্যাসের চরিত্র জেমস বন্ডের নাম নিজের নামে জুড়ে দেয় নয়ন। ফলে সহযোগীরা তাকে ডাকা শুরু করে ‘নয়ন বন্ড’নামে।

জানতে চাইলে বরগুনা সদর থানার ওসি আবীর হোসেন বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্রত্যেকবারই গ্রেফতার ছিল নয়ন। তবে কারাগার থেকে বের হয়ে এসে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ত।

অবশ্য অনেকেই বলছেন, এলাকার চিহ্নিত অপরাধী হওয়া সত্বেও বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় আইনে ফাঁক-ফোকর দিয়ে মুক্ত হতেন।  তারপর আরও ভয়ানক হয়ে উঠতে থাকেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

posted by: সময় সংযোগ টুয়েন্টিফোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Copyright © by somoy songjog 24 | Developed by Md. Rajib